সৌদি ভিসা চেক করার নিয়ম মোবাইলে ঘরে বসে  চেক করার পদ্ধতি

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই একই দুশ্চিন্তা ভিসাটা আসলো কি না। বিশেষ করে যারা প্রথমবার সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের কাছে এজেন্সি অফিসে বারবার ফোন করা বা দৌড়ানোর ঝামেলা এড়াতে সবচেয়ে বড় স্বস্তি হলো নিজে নিজে, হাতের মোবাইল দিয়েই ভিসার সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়া। ভালো খবর হলো, এই কাজটা এখন সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ঘরে বসেই কয়েক মিনিটে করা যায় কোনো দালাল বা এজেন্সির সাহায্য ছাড়াই।

সৌদি আরবে প্রতি বছর লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী পাড়ি জমান, আর তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ভিসা প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হন ভিসা এখন কোন অবস্থায় আছে, অনুমোদন হয়েছে কি না, নাকি কোথাও আটকে আছে। এজেন্সির ভরসায় বসে থাকার বদলে নিজে নিজে যাচাই করতে পারলে মানসিক দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়, আর প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও কমে। এই লেখায় ধাপে ধাপে দেখানো হলো কীভাবে মোবাইল দিয়ে সৌদি ভিসার স্ট্যাটাস চেক করবেন, কী কী তথ্য হাতের কাছে রাখতে হবে, এবং চেক করার সময় সাধারণত যেসব সমস্যায় মানুষ আটকে যায় সেগুলোর সমাধান।

কেন নিজে ভিসা চেক করা জরুরি

অনেকেই মনে করেন ভিসার খোঁজখবর রাখা শুধু এজেন্সির দায়িত্ব, নিজে যাচাই করার দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এজেন্সি বা দালালের কথার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করলে কয়েকটি ঝুঁকি থেকে যায়। প্রথমত, কিছু অসাধু দালাল ভিসা এখনও প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থাতেই “ভিসা হয়ে গেছে” বলে বাড়তি টাকা দাবি করে। দ্বিতীয়ত, ভিসার মেয়াদ, এন্ট্রি টাইপ (সিঙ্গেল না মাল্টিপল), বা পেশার নাম ভুল থাকলে তা সময়মতো ধরা না পড়লে বিমানবন্দরে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। নিজে নিয়মিত চেক করলে এই ধরনের ভুল আগেভাগে চোখে পড়ে, এবং সংশোধনের জন্য সময়ও হাতে থাকে।

তৃতীয়ত, নিজে ভিসা যাচাই করার অভ্যাস থাকলে ভবিষ্যতে ইকামা নবায়ন, এক্সিট-রি-এন্ট্রি ভিসা, বা কাজের অনুমতির মেয়াদ নিয়েও নিজে নিজে খোঁজ রাখা সহজ হয়ে যায় কারণ পদ্ধতিটা মূলত একই রকম থাকে।

ভিসা চেক করার আগে যা হাতের কাছে রাখতে হবে

মোবাইল দিয়ে ভিসা স্ট্যাটাস চেক করতে হলে নিচের তথ্যগুলো প্রস্তুত রাখুন, নাহলে মাঝপথে আটকে যেতে হবে:

  • পাসপোর্ট নম্বর (ইংরেজি হরফে, বড় হাতের অক্ষরে, ভুল বানান বা স্পেস ছাড়া)
  • পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ
  • জন্ম তারিখ (পাসপোর্টে যেভাবে লেখা আছে ঠিক সেভাবে — দিন, মাস, বছরের ক্রম ভুল হলে ফলাফল আসবে না)
  • জাতীয়তা (Bangladesh নির্বাচন করতে হবে)
  • ভিসা নম্বর, যদি এজেন্সি থেকে আগেই পেয়ে থাকেন
  • মোবাইল নম্বর বা ইমেইল, কিছু পোর্টালে যাচাইয়ের জন্য OTP পাঠানো হতে পারে

এই তথ্যগুলো একসাথে একটা নোট অ্যাপে লিখে রাখলে বারবার পাসপোর্ট বের করে দেখার ঝামেলা থাকবে না।

সৌদি ভিসা চেক করার নিয়ম মোবাইলে ঘরে বসে  চেক করার পদ্ধতি

প্রথম ধাপ — সরকারি ওয়েবসাইটে ঢুকুন মোবাইলের ব্রাউজারে (ক্রোম বা যেকোনো ব্রাউজার) সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিসা যাচাইয়ের অফিসিয়াল পোর্টালে যান। ঠিকানা টাইপ করার সময় বানান খেয়াল করে লিখবেন, কারণ ভুয়া ওয়েবসাইট দিয়ে প্রতারণার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ওয়েবসাইটের ঠিকানার শুরুতে “https” আছে কি না এবং ব্রাউজারে তালা চিহ্ন (secure) দেখাচ্ছে কি না সেটাও লক্ষ্য রাখুন।

দ্বিতীয় ধাপ — সঠিক অপশন বেছে নিন সাইটে ঢোকার পর সাধারণত দুটো অপশন থাকে — একটি ভিজিট বা ওয়ার্ক ভিসার আবেদনকারীদের জন্য, আরেকটি ইতিমধ্যে ইস্যু হওয়া ভিসার স্ট্যাটাস দেখার জন্য। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী “Visa Inquiry” বা “Check Visa Status” অপশনে ক্লিক করুন। ওয়ার্ক ভিসার ক্ষেত্রে কখনো কখনো “Query Visa” নামেও অপশনটি থাকে।

তৃতীয় ধাপ — তথ্য পূরণ করুন পাসপোর্ট নম্বর, জন্ম তারিখ ও জাতীয়তা সঠিকভাবে ইংরেজিতে বসান। একটা ছোট বানান ভুলেই ফলাফল “Not Found” দেখাতে পারে, তাই এই ধাপে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। মোবাইলের ছোট কি-বোর্ডে টাইপ করার সময় একবার লেখা শেষ করে আবার চেক করে নিন।

চতুর্থ ধাপ — ক্যাপচা পূরণ করে সাবমিট করুন বটের মাধ্যমে অপব্যবহার ঠেকাতে বেশিরভাগ পোর্টালে ছবির মাধ্যমে যাচাই (ক্যাপচা) করতে হয়। এটা পূরণ করে “Search” বা “Submit” বাটনে চাপুন। ক্যাপচা অস্পষ্ট মনে হলে রিফ্রেশ করে নতুন একটা চেষ্টা করতে পারেন, বেশিরভাগ সাইটে এই সুবিধা থাকে।

পঞ্চম ধাপ — ফলাফল দেখুন সব তথ্য সঠিক হলে স্ক্রিনে ভিসার বর্তমান অবস্থা দেখাবে অনুমোদিত (Approved), প্রক্রিয়াধীন (Under Process), নাকি বাতিল (Cancelled)। ভিসা অনুমোদিত হয়ে থাকলে ভিসা নম্বর, ইস্যুর তারিখ ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখও দেখানো হবে, যা পরবর্তীতে টিকিট বুকিং বা এম্বাসি অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় কাজে লাগবে। ফলাফলের স্ক্রিনশট মোবাইলে রেখে দিন প্রয়োজনে এজেন্সিকে দেখানোর জন্য কাজে আসবে।

Absher অ্যাপ দিয়ে চেক করার বিকল্প উপায়

যারা ইতিমধ্যে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বা আগে থেকেই Absher প্ল্যাটফর্মে রেজিস্ট্রেশন করা আছে, তারা মোবাইল অ্যাপ থেকেও ভিসা ও ইকামার তথ্য দেখতে পারেন। অ্যাপ স্টোর বা প্লে স্টোর থেকে “Absher” সার্চ করে ইনস্টল করুন, সৌদি মোবাইল নম্বর বা আইডি দিয়ে লগইন করুন, এরপর “Visas” বা “Query” সেকশনে গিয়ে বিস্তারিত দেখা যায়। Absher-এর মাধ্যমে ইকামার মেয়াদ, এক্সিট-রি-এন্ট্রি অনুমতি, এমনকি ট্র্যাফিক জরিমানার তথ্যও দেখা যায় যা দীর্ঘমেয়াদে সৌদি প্রবাসীদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ হয়ে ওঠে।

তবে যারা এখনও বাংলাদেশে আছেন এবং প্রথমবার ভিসার জন্য অপেক্ষা করছেন, তাদের জন্য প্রথম পদ্ধতিটিই (ওয়েবসাইট থেকে চেক করা) সহজ ও প্রযোজ্য, কারণ Absher-এ রেজিস্ট্রেশনের জন্য সাধারণত সৌদি আরবে অবস্থানরত অবস্থাতেই আইডি ভেরিফিকেশন করতে হয়।

এজেন্সির মাধ্যমে যাচাই করার বিকল্প পদ্ধতি

কারো যদি মনে হয় নিজে নিজে অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করা কঠিন লাগছে, তাহলে যে এজেন্সির মাধ্যমে ভিসার আবেদন করা হয়েছে তাদের কাছ থেকে ভিসা নম্বর সংগ্রহ করে সেটা দিয়ে যাচাই করা যায়। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস বা কনস্যুলেটের হেল্পলাইনেও যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর জানা সম্ভব, যদিও এতে সাধারণত অনলাইন পদ্ধতির চেয়ে বেশি সময় লাগে।

যেসব সমস্যায় সাধারণত আটকে যান

“Not Found” দেখাচ্ছে — এর মানে সাধারণত এই নয় যে ভিসা বাতিল হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট নম্বর বা জন্ম তারিখ ভুল বসানো হয়েছে, অথবা ভিসা এখনও প্রসেসিং-এ আছে বলে সিস্টেমে আপডেট হয়নি। কয়েক দিন পর আবার চেষ্টা করুন। একটানা কয়েকবার একই ভুল তথ্য দিয়ে চেষ্টা না করে, পাসপোর্টের সাথে মিলিয়ে আবার নতুন করে টাইপ করুন।

ওয়েবসাইট লোড হচ্ছে না বা স্লো — সৌদি সরকারি পোর্টালে মাঝে মাঝে ভিড়ের কারণে সমস্যা হয়, বিশেষ করে দিনের ব্যস্ত সময়ে বা ছুটির পরদিন। রাতের দিকে বা কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করলে সমাধান হয়ে যায়। ওয়াইফাই সংযোগ থাকলে মোবাইল ডেটার বদলে সেটা ব্যবহার করলে লোডিং দ্রুত হতে পারে।

ক্যাপচা বারবার ভুল দেখাচ্ছে — মোবাইলের ব্রাউজার জুম করে ক্যাপচার ছবিটা বড় করে দেখুন, অনেক সময় ছোট স্ক্রিনে অক্ষর গুলিয়ে যায়। প্রয়োজনে মোবাইলকে অনুভূমিক (ল্যান্ডস্কেপ) মোডে ঘুরিয়ে দেখলে পড়তে সুবিধা হয়।

তথ্য মিলছে কিন্তু স্ট্যাটাস অস্পষ্ট _ কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজি টার্মিনোলজি (যেমন “Under Review” বা “Pending Approval”) বুঝতে সমস্যা হয়। এমন হলে এজেন্সিকে স্ক্রিনশট পাঠিয়ে অর্থ জিজ্ঞাসা করে নেওয়াই নিরাপদ, ভুল অনুমান করে এগিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।

সতর্কতা ভুয়া ওয়েবসাইট থেকে সাবধান

ভিসা চেক করার নামে অনেক ভুয়া ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ ছড়িয়ে আছে, যেগুলো ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বা টাকা দাবি করে। এসব ভুয়া সাইট প্রায়ই আসল সরকারি সাইটের মতো দেখতে ডিজাইন করা হয়, তাই শুধু চেহারা দেখে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। মনে রাখবেন, সরকারি ভিসা যাচাইয়ের সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কোথাও টাকা চাইলে বুঝবেন সেটা প্রতারণা। সৌদি ভিসা চেক করার নিয়ম মোবাইলে ঘরে বসে কোনো ওয়েবসাইট লিংক অপরিচিত ফেসবুক গ্রুপ বা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ থেকে পেলে সরাসরি ক্লিক না করে, প্রথমে গুগলে সার্চ করে অফিসিয়াল সোর্স যাচাই করে নেওয়া নিরাপদ। সন্দেহ হলে এজেন্সি বা দূতাবাসের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে নিন।

ভিসা অনুমোদনের পর করণীয়

ভিসা স্ট্যাটাস “Approved” দেখানোর পর কাজ কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এরপর সাধারণত করণীয় থাকে:

  • ভিসার কপি ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করা
  • পাসপোর্টের মেয়াদ ভিসার মেয়াদের সাথে মিলিয়ে দেখা (পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস থাকা জরুরি)
  • বিমান টিকিট বুকিং করার আগে ভিসায় উল্লেখিত এন্ট্রির তারিখ ও মেয়াদ ভালোভাবে যাচাই করা
  • প্রয়োজনীয় মেডিকেল সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা, যেগুলো ভিসা প্রসেসের সাথে সম্পর্কিত

শেষ কথা

মোবাইল দিয়ে সৌদি ভিসা চেক করা একবার রপ্ত হয়ে গেলে এটি মাত্র দুই-তিন মিনিটের কাজ। নিয়মিত আপডেট জানার জন্য সপ্তাহে একবার বা এজেন্সি থেকে খবর পাওয়ার পর যাচাই করে নেওয়াই যথেষ্ট। সঠিক তথ্য নিয়ে প্রস্তুত থাকলে অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা এড়িয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে নিজের ভিসা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারবেন, আর একই সাথে প্রতারণার ফাঁদেও পা দেওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।

Leave a Comment